বাংলাদেশ ক্রিকেটব্রেকিং নিউজ

নাহিদ রানার ঝলকে ঐতিহাসিক জয় — ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারাল বাংলাদেশ

নাহিদ রানার ঝলকে ঐতিহাসিক জয় — ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারাল বাংলাদেশ

post1

মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পঞ্চম দিনের শেষ সেশনটা যেন ছিল এক থ্রিলার সিনেমার চূড়ান্ত দৃশ্য। ড্র, জয়, পরাজয় — তিনটি সম্ভাবনাই তখনও বেঁচে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ের হাসিটা বাংলাদেশেরই হলো। নাহিদ রানার পাঁচ উইকেটের ঝলকে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা।

ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়

এটা শুধু একটা টেস্ট জয় নয়। ২০২৪ সালের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে কখনো জেতেনি বাংলাদেশ। সেই দেয়াল একবার ভাঙার পর এখন পরপর তিনটি টেস্ট জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। আর এবারেরটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য — এটাই ছিল নিজেদের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। ঘরের দর্শকদের সামনে এই বিজয় আরও বেশি মধুর।

শেষ সেশনের টান টান উত্তেজনা

পঞ্চম দিনের শেষ সেশন শুরুর আগে পরিস্থিতিটা ছিল এরকম — পাকিস্তানের দরকার ছিল আরও ১৫২ রান, হাতে সাত উইকেট। মাঠে তখন আব্দুল্লাহ ফজল এবং সালমান আলি আঘা। ডেবিউ ম্যাচে ফজল ৬৬ রানে অপরাজিত ছিলেন, আর তাঁর ব্যাটিং দেখে মনেই হচ্ছিল না এটা তাঁর প্রথম টেস্ট। সালমানের সঙ্গে তিনি চতুর্থ উইকেটে যোগ করেছিলেন ৪৮ রান।

পঞ্চম দিনের পিচ তখন বেশ ক্লান্ত — বাউন্স অসমান, বল ঘুরছে। পাকিস্তানের জয় প্রায় অসম্ভব ছিল, কিন্তু খারাপ আলো আর ড্র-এর সম্ভাবনা আটকে রেখেছিল খেলাটাকে। ফজল যতক্ষণ ক্রিজে, পাকিস্তানের একটা আশা টিমটিম করে জ্বলছিল।

কিন্তু শেষ সেশনের মাত্র পাঁচ বল পরেই সব বদলে গেল।

তাইজুলের সেই বলে ভাঙল পাকিস্তানের মেরুদণ্ড

তাইজুল ইসলামের একটি ডেলিভারি পিচে পড়ে ভয়ংকরভাবে ঘুরল এবং ভেতর দিয়ে ফজলের প্যাডে আঘাত করল। মাঠের আম্পায়ার রিচার্ড কেটলবরো আউট দেননি। কিন্তু রিভিউয়ে তিনটি লাল আলো জ্বলে উঠল — ফজলের সাহসী ইনিংসের সমাপ্তি ঘটল ৬৬ রানে। ডেবিউ টেস্টে দুই ইনিংসেই পঞ্চাশোর্ধ্ব রান করা পাকিস্তানের ষষ্ঠ ব্যাটার হলেন ফজল, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

পিভোটাল উইকেট পড়লে প্রায়ই পরের উইকেটও তাৎক্ষণিকভাবে পড়ে যায় — এবারও তা-ই হলো। পরের ওভারেই তাসকিন আহমেদের বলে সালমান একটি চওড়া ফুল ডেলিভারিতে অযাচিত শট খেলতে গিয়ে গালিতে ক্যাচ দিলেন। দুটো উইকেট পড়তেই পাকিস্তানের পালাবার পথ বন্ধ হয়ে গেল।

রিজওয়ানের শেষ চেষ্টা, নাহিদের নির্মম জবাব

পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়

মোহাম্মদ রিজওয়ান প্রথম বলেই এলবিডব্লিউ আউট হওয়ার হাত থেকে রিভিউ নিয়ে বাঁচলেন। সাউদ শাকিলকে নিয়ে ড্রিংকস ব্রেক পর্যন্ত আর কোনো বিপদ হলো না। পাকিস্তানের তখনও দরকার ছিল ১১৯ রান, হাতে পাঁচ উইকেট।

তখন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বোলিংয়ে ফেরালেন নাহিদ রানাকে।

প্রথম স্পেলে তিনি ৫ ওভারে ৩০ রান দিয়েছিলেন — বেশি খরুচে। কিন্তু যা হলো এরপর তা ছিল নিছক বোলিং মাস্টারক্লাস। প্রথমে শাকিলকে ড্রাইভে প্রলুব্ধ করে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বের করলেন। তারপর পরের ওভারে এলো সেই অসাধারণ বলটি — ১৪৭ কিলোমিটার গতিতে নিপ-ব্যাকার, রিজওয়ান শোল্ডার আর্মস করলেন অথচ বল ধেয়ে গিয়ে সরাসরি স্টাম্প ভাঙল। ওই একটি ডেলিভারিই বলে দিল নাহিদ রানা কেন এখন বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের নতুন ভরসা।

এরপর তাইজুল হাসান আলিকে এলবিডব্লিউ করলেন আর্ম বলে। ইনিংসের শেষটুকু মোড়া হলো নাহিদ রানার নামে — নোমান আলিকে এলবিডব্লিউর রিভিউয়ে ফেলে এবং শাহিন আফ্রিদিকে ক্যাচ আউট করে সম্পন্ন হলো ঐতিহাসিক জয়। নাহিদের চূড়ান্ত স্কোর: ৫ উইকেট, মাত্র ৪০ রানে।

সকালের ব্যাটিংয়ে শান্তর নেতৃত্ব

পঞ্চম দিনের শুরুটা ছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং দিয়ে। ২০ ওভারে ৮৮ রান যোগ করে ২৬৮ রানের লক্ষ্য ঠিক করে দিলেন তাঁরা। সেই ইনিংসে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৭ রানের একটি দায়িত্বশীল ইনিংস খেললেন। পুরো দ্বিতীয় ইনিংসে মোমিনুল হকের ৫৬ রানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

লাঞ্চের আগেই পাকিস্তানের ওপেনার ইমাম-উল-হকের উইকেট তুলে নেন তাসকিন। কিন্তু দ্বিতীয় সেশনে ফজল একাই প্রতিরোধ গড়লেন। মেহেদিকে পরপর দুটো বাউন্ডারি, নাহিদকে একই ওভারে তিনটি চার — ডেবিউ ম্যাচে এই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দেখে অবাক হওয়ার কথা। মেহেদি পাল্টা আঘাত করে আজান আওয়াইসকে ১৫ রানে বোল্ড করলেন এবং নাহিদ রানা শেষ করলেন শান মাসুদকে মাত্র ২ রানে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বের করে।

তবু ফজল অবিচল রইলেন। ইবাদতের বলে একটি আপার-কাট মেরে পৌঁছালেন পঞ্চাশে — তখন পর্যন্ত পাকিস্তান লড়ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই অপ্রতুল প্রমাণিত হলো।

নাহিদ রানা — নতুন বাংলাদেশের প্রতীক

নাহিদ রানা এখন আর শুধু একটি নাম নন। প্রতিটি স্পেলের সঙ্গে তাঁর সুনাম বাড়ছে। এই টেস্টে তাঁর বোলিং ছিল বাংলাদেশ পেস বোলিংয়ের নতুন পরিচয়ের ঘোষণা। ১৪০ পেরোনো গতি, নিপ-ব্যাকার, লেট মুভমেন্ট — পাকিস্তানের মতো দলকে শেষ সেশনে এভাবে ধসিয়ে দেওয়া সহজ কাজ নয়।

বাংলাদেশ পাকিস্তান টেস্ট, নাহিদ রানা ৫ উইকেট, মিরপুর টেস্ট ২০২৪, বাংলাদেশ টেস্ট জয়, আব্দুল্লাহ ফজল ডেবিউ

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড

বাংলাদেশ: ৪১৩ ও ২৪০/৯ ডিক্লেয়ার (নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৭, মোমিনুল হক ৫৬; হাসান আলি ৩/৫২) পাকিস্তান: ৩৮৬ ও ১৬৩ (আব্দুল্লাহ ফজল ৬৬; নাহিদ রানা ৫/৪০) ফলাফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী

সিলেটে ফের ঝাঁঝ? পাকিস্তানকে সিরিজে ধুলোয় মেলাতে পারবে টাইগাররা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *